রোজা রেখে ব্রাশ করা যায় কি, রোজাদার ব্যক্তির করণীয়
রোজা রেখে ব্রাশ করা যায় কি, রোজাদার ব্যক্তির করণীয়
রোজা রেখে ব্রাশ করা যায় কি, রোজাদার ব্যক্তির করণীয়
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও বরকতময় একটি মাস। এই মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও অন্যান্য কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন, রোজা রেখে কি দাঁত ব্রাশ করা যায়? ব্রাশ করলে কি রোজা ভেঙে যাবে? আবার রোজাদার ব্যক্তির করণীয় কী কী?
এই বিস্তারিত আর্টিকেলে আমরা রোজা রেখে ব্রাশ করার বিধান, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি, সতর্কতা এবং রোজাদার ব্যক্তির করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো।
রোজা রেখে ব্রাশ করা যায় কি
ইসলামি শরিয়তের আলোকে রোজা রেখে দাঁত ব্রাশ করা জায়েজ, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা মেনে চলতে হবে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ
রোজার সময় মুখ পরিষ্কার রাখা নিষিদ্ধ নয়। বরং পরিচ্ছন্নতা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহানবী নিজেও মিসওয়াক ব্যবহার করতেন।
হাদিসে এসেছে:
“যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদের প্রতি নামাজের আগে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।”Sahih al-Bukhari
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, দাঁত পরিষ্কার রাখা সুন্নত ও উত্তম কাজ।
টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করলে কি রোজা ভাঙে?
রোজা ভাঙবে না যদি:
টুথপেস্ট বা পানি গলার ভেতরে না যায়
ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু গিলে না ফেলা হয়
রোজা ভেঙে যাবে যদি:
ইচ্ছাকৃতভাবে টুথপেস্ট বা পানি গিলে ফেলা হয়
অসাবধানতাবশত গলার ভিতরে চলে যায়
অতএব, ব্রাশ করা যাবে, তবে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
মিসওয়াক ব্যবহার করা কি উত্তম?
হ্যাঁ, রোজার সময় মিসওয়াক ব্যবহার করা উত্তম ও সুন্নত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ রোজা অবস্থায়ও মিসওয়াক করতেন। অনেক আলেমের মতে, রোজা রেখে মিসওয়াক করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।
উল্লেখ আছে: Sunan Abu Dawood
রোজা রেখে কখন ব্রাশ করা ভালো?
রোজা রেখে দাঁত ব্রাশ করার সবচেয়ে নিরাপদ সময় হলো:
সাহরির পর ফজরের আগে
ইফতারের পর
দুপুরে বা রোজা অবস্থায় ব্রাশ করলে:
খুব অল্প টুথপেস্ট ব্যবহার করুন
মুখ ভালোভাবে কুলি করুন
গলার ভেতরে পানি না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন
রোজাদার ব্যক্তির করণীয়
রোজা শুধু না খেয়ে থাকার নাম নয়; এটি আত্মসংযম, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাস। তাই রোজাদার ব্যক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে।
১️। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা
রমজানে নামাজের গুরুত্ব আরও বেশি। বিশেষ করে তারাবির নামাজ আদায় করা উচিত।
তারাবির নামাজের প্রচলন হয় Umar ibn al-Khattab -এর সময়ে জামাতে আদায়ের মাধ্যমে সুসংগঠিতভাবে।
২️। কুরআন তিলাওয়াত করা
রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস। তাই বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত।
কুরআন নাজিল হয়েছিল Qur'an – যা মানবজাতির জন্য হেদায়েত।
৩️। গীবত ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা
রোজা রেখে শুধু খাবার থেকে বিরত থাকলেই হবে না। জিহ্বাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার রোজা রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
৪️। দান-সদকা করা
রমজান মাসে দান করলে সওয়াব বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। অসহায় মানুষকে সাহায্য করা রোজার অন্যতম শিক্ষা।
৫️। ধৈর্য ধারণ করা
রোজা ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও কষ্ট সহ্য করে আত্মশুদ্ধি অর্জনই রোজার উদ্দেশ্য।
রোজাদারের যে কাজগুলো থেকে বিরত থাকা উচিত
১. ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খাওয়া বা পান করা
২. ধূমপান করা
৩. অশ্লীল কথা বলা
৪. ঝগড়া-বিবাদ করা
৫. গালাগালি করা
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ
ইচ্ছাকৃত খাওয়া বা পান করা
সহবাস
ইচ্ছাকৃত বমি করা
মাসিক শুরু হওয়া (নারীদের ক্ষেত্রে)
রোজা অবস্থায় মুখের দুর্গন্ধের কারণ
অনেক সময় রোজার সময় মুখে দুর্গন্ধ হয়। এটি পেট খালি থাকার কারণে হয়।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।”
ডাক্তারের দৃষ্টিতে রোজা রেখে ব্রাশ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করা জরুরি। রমজানে অন্তত সাহরি ও ইফতারের পর ভালোভাবে ব্রাশ করা উচিত।
যাদের দাঁতের সমস্যা রয়েছে তারা:
নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন
অল্প টুথপেস্ট ব্যবহার করুন
কুলি করার সময় সতর্ক থাকুন
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
রোজা রেখে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যাবে?
যাবে, তবে গিলে ফেলা যাবে না।
রক্ত বের হলে রোজা ভাঙবে?
দাঁত থেকে সামান্য রক্ত বের হলে এবং গিলে না ফেললে রোজা ভাঙবে না।
রোজা রেখে ডাক্তারি চিকিৎসা?
ইনজেকশন বা রক্ত পরীক্ষা করলে সাধারণত রোজা ভাঙে না (যদি পুষ্টিকর কিছু শরীরে প্রবেশ না করে)।
রমজানের আসল শিক্ষা
রমজান আত্মসংযম, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে আমাদের উচিত:
বেশি বেশি ইবাদত করা
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া
মানুষের সাথে ভালো আচরণ করা
আমাদের চূড়ান্ত কথা: রোজা রেখে ব্রাশ করা যায় কি, রোজাদার ব্যক্তির করণীয়
রোজা রেখে দাঁত ব্রাশ করা জায়েজ, তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে কিছু গলার ভেতরে না যায়। মিসওয়াক ব্যবহার করা উত্তম। রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়; এটি আত্মসংযম, ধৈর্য ও ইবাদতের এক অনন্য প্রশিক্ষণ।
রমজান মাসে আমাদের উচিত নিজেদের চরিত্র উন্নত করা, নামাজ-রোজা ঠিকভাবে আদায় করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রোজা পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url