জলাতঙ্ক কি, জলাতঙ্কের কারণ ও প্রতিকার
জলাতঙ্ক কি, জলাতঙ্কের কারণ ও প্রতিকার
জলাতঙ্ক কি? জলাতঙ্কের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার
জলাতঙ্ক (Rabies) একটি মারাত্মক ও প্রায় সর্বদা প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। এই রোগ মূলত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।
আরো পড়ুনঃ
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশে এখনো জলাতঙ্ক একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা ও সঠিক প্রতিরোধই এই রোগ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়। এই আর্টিকেলে আমরা জানব, জলাতঙ্ক কী, কীভাবে হয়, লক্ষণগুলো কী, কী করলে প্রতিরোধ করা যায় এবং আক্রান্ত হলে কী করণীয়।
জলাতঙ্ক কি, জলাতঙ্ক রোগের ইতিহাস
জলাতঙ্ক হলো Rabies virus দ্বারা সৃষ্ট একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এটি মূলত স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে। একবার লক্ষণ প্রকাশ পেলে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। জলাতঙ্ক সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে ছড়ায়, যা কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানে লেগে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
জলাতঙ্ক রোগের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান চিকিৎসাশাস্ত্রে এই রোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রথম সফল জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন, যা আজও অসংখ্য প্রাণ বাঁচাচ্ছে।
জলাতঙ্কের কারণ
জলাতঙ্ক রোগের প্রধান কারণ হলো Rabies virus। তবে এই ভাইরাস কীভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাতঙ্কের প্রধান কারণগুলো হলোঃ
১. আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ঃ জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীর কামড়ই এই রোগের সবচেয়ে বড় কারণ। বিশেষ করে, কুকুর, বিড়াল, বাদুড়, শেয়াল, বানর, বাংলাদেশে প্রায় ৯০% জলাতঙ্ক কুকুরের কামড়ের কারণে হয়।
২. আঁচড় বা চামড়া ছিঁড়ে যাওয়াঃ আক্রান্ত প্রাণীর নখে থাকা লালা আঁচড়ের মাধ্যমে শরীরে ঢুকলেও জলাতঙ্ক হতে পারে।
৩. খোলা ক্ষতে লালা লাগাঃ যদি খোলা ক্ষতে বা চোখ, মুখ, নাকে আক্রান্ত প্রাণীর লালা লাগে, তাহলেও ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে।
৪. বাদুড়ের সংস্পর্শঃ কিছু ক্ষেত্রে বাদুড়ের কামড় বোঝা যায় না, কিন্তু তাতেও জলাতঙ্ক হতে পারে।
জলাতঙ্কের ইনকিউবেশন পিরিয়ড
ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলতে বোঝায়, ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর লক্ষণ দেখা দিতে যে সময় লাগে।সাধারণত: ১–৩ মাস। কখনো কখনো: ৭ দিন থেকে ১ বছর বা তার বেশি। কামড়ের স্থান যত মস্তিষ্কের কাছে হবে, লক্ষণ তত দ্রুত দেখা দেয়।
জলাতঙ্কের লক্ষণ
জলাতঙ্কের লক্ষণ ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়। প্রাথমিক লক্ষণঃ এই পর্যায়ে লক্ষণগুলো সাধারণত হালকা হয়ঃ জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, কামড়ের জায়গায় ব্যথা, জ্বালা বা চুলকানি, অস্বস্তি ও অস্থিরতা, মাঝারি পর্যায়ের লক্ষণ। অতিরিক্ত উত্তেজনা। অস্বাভাবিক আচরণ, ঘুমের সমস্যা, আলো বা শব্দে ভয়।
অতিরিক্ত লালা ঝরা, শেষ পর্যায়ের লক্ষণ, এই পর্যায়টি সবচেয়ে ভয়ংকর। পানি দেখলে বা পান করতে গেলে তীব্র ভয় (Hydrophobia), শ্বাসকষ্ট, পেশিতে খিঁচুনি, পক্ষাঘাত, অচেতনতা, মৃত্যু। এই পর্যায়ে পৌঁছালে রোগীকে বাঁচানো যায় না।
জলাতঙ্ক কেন এত ভয়ংকর
এটি ১০০% প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু লক্ষণ দেখা দিলে প্রায় ১০০% প্রাণঘাতী। একবার স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হলে কোনো ওষুধ কাজ করে না। এই কারণেই জলাতঙ্ককে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর রোগ বলা হয়।
জলাতঙ্কের প্রতিকার (চিকিৎসা)
জলাতঙ্কের প্রতিকার বলতে মূলত লক্ষণ প্রকাশের আগেই চিকিৎসা গ্রহণ করাকে বোঝায়। কামড়ের পর তাৎক্ষণিক করণীয়। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ১. ক্ষতস্থান ধোয়াঃ কামড় বা আঁচড়ের স্থান কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধরে। প্রচুর পানি ও সাবান দিয়ে ধুতে হবে। এটি ভাইরাসের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়. ২. অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহারঃ পভিডন আয়োডিন বা অ্যালকোহল ব্যবহার করা যেতে পারে। ৩. সেলাই না করাঃ কামড়ের ক্ষত সাধারণত সেলাই করা উচিত নয়।
জলাতঙ্কের টিকা
জলাতঙ্ক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা। পোস্ট-এক্সপোজার প্রফাইল্যাক্সিস (PEP). কামড়ের পর যে টিকা দেওয়া হয়: সাধারণত ৪ বা ৫ ডোজ, নির্দিষ্ট দিনে দেওয়া হয়. সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG)। গুরুতর কামড়ের ক্ষেত্রে, ক্ষতের চারপাশে দেওয়া হয়।
এটি তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়, জলাতঙ্ক কি নিরাময়যোগ্য। না। লক্ষণ প্রকাশের পর জলাতঙ্কের কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। তাই একমাত্র উপায় হলোঃ দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, সময়মতো টিকা নেওয়া। জলাতঙ্ক প্রতিরোধের উপায়।
কুকুর ও পোষা প্রাণীর টিকাদান
নিয়মিত রেবিস টিকা দেওয়া। এতে মানুষের ঝুঁকি অনেক কমে।
রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ
টিকাদান ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। এটি সামাজিক উদ্যোগের অংশ।
শিশুদের সচেতনতা
অপরিচিত প্রাণী থেকে দূরে থাকা। কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে জানানো।
ভ্যাকসিন সম্পর্কে সচেতনতা
গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায়। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহজলভ্য করা।
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক পরিস্থিতি
বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয় এবং এখনো জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তবে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি ও সচেতনতায় ধীরে ধীরে মৃত্যুহার কমছে।
আরো পড়ুনঃ
জলাতঙ্ক নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
“কুকুর পাগল না হলে জলাতঙ্ক হয় না”। ভুল, আক্রান্ত প্রাণী সবসময় পাগল দেখায় না। “ছোট আঁচড়ে কিছু হয় না”। ভুল, ছোট আঁচড়েও ভাইরাস ঢুকতে পারে। “লোকজ চিকিৎসায় সেরে যায়”। মারাত্মক ভুল, এতে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
আমাদের শেষ মন্তব্যঃ জলাতঙ্ক কি, জলাতঙ্কের কারণ ও প্রতিকার
জলাতঙ্ক একটি নীরব ঘাতক রোগ, যা একবার প্রকাশ পেলে রক্ষা নেই, কিন্তু আগেভাগে প্রতিরোধ করলে সম্পূর্ণভাবে বাঁচা সম্ভব। তাই প্রাণীর কামড়কে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, সঠিক টিকা গ্রহণ এবং সচেতনতা, এই তিনটি বিষয়ই জলাতঙ্ক প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি। একটু সচেতনতাই বাঁচাতে পারে একটি জীবন।



অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url